🗳️আসছে নির্বাচন ২০২৬ - আপনার মতামত দিন!
রাজনীতিজাতীয়জীবনযাপন

বেগম খালেদা জিয়া: আপোষহীন নেত্রীর জন্ম থেকে বিদায়ের মহাকাব্য

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, ‘আপসহীন নেত্রী’ খ্যাত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার এই বিদায় কেবল একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসের এক বিশাল অংশের যবনিকা।

দিনাজপুরের সেই ছোট্ট মেয়ে ‘পুতুল’ থেকে কীভাবে তিনি কোটি মানুষের ‘দেশনেত্রী’ হয়ে উঠলেন—তার বর্ণাঢ্য জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন এক একটি ইতিহাস।

জন্ম ও শৈশব: দিনাজপুরের ‘পুতুল’

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট (মতান্তরে ১৯৪৬) ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা খানম, যার ডাকনাম ছিল ‘পুতুল’। তার পৈতৃক নিবাস ছিল ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন একজন চা ব্যবসায়ী এবং মা তৈয়বা মজুমদার ছিলেন গৃহিণী।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তার পরিবার জলপাইগুড়ি থেকে দিনাজপুরে চলে আসে। সেখানেই কাটে তার শৈশব ও কৈশোর। তিনি দিনাজপুর মিশনারি স্কুল এবং পরে দিনাজপুর গার্লস হাইস্কুলে লেখাপড়া করেন। ১৯৬০ সালে তিনি মেট্রিকুলেশন পাস করেন এবং পরবর্তীতে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন।

জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ে ও সংসার

১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি ‘খালেদা জিয়া’ নাম ধারণ করেন। বিয়ের পর ১৯৬৫ সালে তিনি স্বামীর সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে যান।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে আসেন। তবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাকে দুই শিশুপুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ গ্রেফতার করে। দীর্ঘ ৯ মাস তিনি ক্যান্টনমেন্টের কারাগারে বন্দি ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি মুক্তি পান। স্বাধীনতার পর স্বামী জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হলে তিনি দেশের ফার্স্ট লেডি হিসেবে পরিচিতি পান, তবে রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখে সাধারণ গৃহবধূর জীবনই বেছে নিয়েছিলেন।

রাজনীতির ময়দানে আবির্ভাব: গৃহবধূ থেকে ‘দেশনেত্রী’

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নির্মমভাবে নিহত হন। এই শোকাবহ ঘটনার পর বিএনপির অস্তিত্ব যখন সংকটের মুখে, তখন দলের নেতাকর্মীদের আহ্বানে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালে তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ‘আপসহীন’ উপাধি

১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তিনি রাজপথে নেতৃত্ব দেন। এই ৯ বছরের আন্দোলনে তাকে একাধিকবার গ্রেফতার ও গৃহবন্দি হতে হয়। কোনো প্রলোভন বা চাপের কাছে মাথা নত না করায় তিনি জনগণের কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার নেতৃত্বেই ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতন ঘটে।

প্রধানমন্ত্রীত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনা

১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার নেতৃত্বে বিএনপি জয়লাভ করে এবং তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার আমলেই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রথম মেয়াদ (১৯৯১-১৯৯৬): তার এই মেয়াদে নারী শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়, চালু হয় মেয়েদের উপবৃত্তি। ভ্যাট প্রথা চালু এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির সূচনাও তার হাত ধরেই।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদ: ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি স্বল্পকালীন এবং ২০০১ সালে চার দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।

১/১১ এবং কারাজীবন

২০০৭ সালের ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়। সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত সাব-জেলে তাকে প্রায় এক বছর বন্দি রাখা হয়। এসময় তার দুই ছেলেকে নির্যাতন ও গ্রেফতার করা হয়। ২০০৮ সালে তিনি মুক্তি পেলেও তার রাজনৈতিক জীবনে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম।

আওয়ামী লীগ শাসনামল: মামলা, রায় ও গৃহবন্দিত্বের দিনলিপি

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে বেগম খালেদা জিয়ার ওপর শুরু হয় একের পর এক আইনি ও রাজনৈতিক চাপ।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা: ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এই দুর্নীতির মামলায় তাকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় (পরে তা বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়)। তাকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে একাকী বন্দি রাখা হয়।

অসুস্থতা ও চিকিৎসা বঞ্চনা: কারাগারে থাকা অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। তিনি লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত হন। পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার আবেদন করা হলেও তৎকালীন সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে।

গৃহবন্দিত্ব: ২০২০ সালে শর্তসাপেক্ষে তাকে গুলশানের বাসা ‘ফিরোজা’য় থাকার অনুমতি দেওয়া হয়, যা কার্যত গৃহবন্দিত্ব ছিল। তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা এবং বিদেশে যেতে না দেওয়া ছিল সেই সময়ের আলোচিত ঘটনা।

শেষ জীবন ও প্রস্থান

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি মুক্তি পান। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তার শারীরিক দুর্বলতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি না ফেরার দেশে চলে যান।

বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সংগ্রামের এক মূর্ত প্রতীক। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের সমাপ্তি হলো।

#বেগম খালেদা জিয়া#খালেদা জিয়ার জীবনী#বিএনপির ইতিহাস#জিয়াউর রহমান#খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন#স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন#প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী#জেল জীবন#বেগম জিয়ার মৃত্যু#Khaleda Zia Biography#BNP History#Life of Khaleda Zia

প্রতিবেদক

বিশেষ প্রতিবেদন, বাকলিয়া নিউজ

মতামত জানাও (0)

সকলের সাথে আপনার চিন্তা শেয়ার করুন

মতামত জানাতে লগিন করুন

আপনার সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্ট ব্যবহার করে সহজেই লগিন করতে পারেন

লোড হচ্ছে...