ঢাকায় ভারত-পাক হ্যান্ডশেক: ২০২৬-এ কি কাটবে যুদ্ধের মেঘ?

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় যোগ দিতে এসে ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক (ডানে)। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) তোলা ছবি। সৌজন্যে: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
২০২৫ সালটি ছিল ভারত ও পাকিস্তানের জন্য বারুদ ও রক্তের বছর। মে মাসে দুই দেশের আকাশযুদ্ধ, ক্রিকেট মাঠে হাত মেলাতে অস্বীকার করা এবং সিন্ধু পানি চুক্তি থেকে ভারতের সরে আসা—সব মিলিয়ে সম্পর্ক ছিল তলানিতে। কিন্তু বছরের শেষ দিন, ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার মাটিতে ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠানে এসে করমর্দন করলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের স্পিকার আয়াজ সাদিক।
ঢাকার এই ‘হ্যান্ডশেক’ বা করমর্দন এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনার ঝড় তুলেছে। বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন—তবে কি ২০২৬ সালে বরফ গলতে যাচ্ছে দুই চিরবৈরী প্রতিবেশীর?
ঢাকায় ঠিক কী ঘটেছিল?
ঘটনাটি ঘটে জাতীয় সংসদ ভবনের একটি ওয়েটিং রুমে। পাকিস্তানের এক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন)-এর প্রবীণ নেতা ও স্পিকার আয়াজ সাদিক।
"জয়শঙ্কর আমার দিকে এগিয়ে এলেন এবং হ্যালো বললেন। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। তিনি হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি যখন নিজের পরিচয় দিতে যাচ্ছিলাম, তিনি বললেন—‘এক্সিলেন্স, আমি আপনাকে চিনি, পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’ তিনি জানতেন তিনি কী করছেন এবং অন্যদের উপস্থিতিতেই তিনি হাসিমুখে এটি করেছেন।"
— আয়াজ সাদিক, স্পিকার, পাকিস্তান
যুদ্ধবিধ্বস্ত ২০২৫ বনাম সম্ভাবনাময় ২০২৬
এই করমর্দন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে হলে পেছনের এক বছরের দিকে তাকাতে হবে। নিচে দুই দেশের সাম্প্রতিক সম্পর্কের একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:
২০২৫ সালের সংঘাত | বর্তমান পরিস্থিতি (২০২৬) |
|---|---|
মে মাসের যুদ্ধ: কাশ্মীর ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে টানা ৪ দিন আকাশযুদ্ধ ও মিসাইল হামলা চলে। | ঢাকার বৈঠক: প্রকাশ্যে দুই দেশের শীর্ষ প্রতিনিধির হাসিমুখে করমর্দন। |
ক্রিকেট বয়কট: সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপে ভারতীয় ক্রিকেটাররা পাকিস্তানিদের সাথে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানায়। | কূটনৈতিক শিষ্টাচার: জয়শঙ্কর নিজে এগিয়ে গিয়ে কথা বলেছেন। |
পানি চুক্তি বাতিল: ভারত সিন্ধু পানি চুক্তি (IWT) থেকে সরে আসে। | নতুন সমীকরণ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা ও চাপের মুখে ভারতের সুর নরম হওয়ার ইঙ্গিত। |
ট্রাম্প ফ্যাক্টর ও পাকিস্তানের নতুন শক্তি
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই নমনীয়তার পেছনে বড় কারণ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান। ট্রাম্প সম্প্রতি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসীম মুনিরকে ‘ফেভারিট ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন (যেখানে পাকিস্তানের জন্য তা ১৯ শতাংশ)।
ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক সায়েদ বলেন, "ভারত বুঝতে পেরেছে যে পাকিস্তানকে অস্বীকার করে বা তারা নেই—এমন ভান করে আর চলা সম্ভব নয়। পাকিস্তান এখন আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাই ন্যূনতম সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্যও এখন বাধ্যবাধকতা।"
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
যদিও মে মাসের যুদ্ধের ক্ষত এখনো দগদগে, তবুও ঢাকার এই ঘটনাকে ‘বরফ গলা’র শুরু হিসেবে দেখছেন অনেকে। বিশ্লেষক লস্করের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ে গোপন বৈঠক বা ‘ব্যাক-চ্যানেল টক’ আবার শুরু হতে পারে। তবে ২০২৬ সালেই পূর্ণাঙ্গ শান্তি আলোচনা শুরু হবে কি না, তা নির্ভর করবে দিল্লির পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ওয়াশিংটনের চাপের ওপর।
প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক





