শীতে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি দ্বিগুণ! গোসল ও ঘুমে যে ভুল করবেন না

ছবি: সংগৃহীত
শীতের সকালে লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমানো বা ধোঁয়া ওঠা পিঠা খাওয়ার আমেজ যতটা আনন্দের, ঠিক ততটাই আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে অসচেতনতা। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর শীতকালে (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) হার্ট অ্যাটাক এবং ব্রেইন স্ট্রোকের ঘটনা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়। বিশেষ করে ভোররাতে বা বাথরুমে গোসল করার সময় এই দুর্ঘটনাগুলো বেশি ঘটে।
কেন শীতে এই ঝুঁকি বাড়ে? গোসল বা ঘুমের সময় আমরা অজান্তেই এমন কী ভুল করি যা প্রাণঘাতী হতে পারে? এবং এর থেকে বাঁচার উপায়ই বা কী? দেশের প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. শীতে কেন হার্ট অ্যাটাক বাড়ে? (বিজ্ঞান কী বলে)
শীতকালে পরিবেশের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার ফলে আমাদের শরীরের রক্তনালীগুলো সংকুচিত (Vasoconstriction) হয়ে যায়। শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে হৃৎপিণ্ডকে তখন অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় এবং রক্ত পাম্প করতে বেশি চাপ দিতে হয়।
রক্তচাপ বৃদ্ধি: রক্তনালী সরু হয়ে যাওয়ায় রক্তচাপ (Blood Pressure) বেড়ে যায়।
রক্ত জমাট বাঁধা: শীতে রক্তের উপাদানগুলো ঘন হতে থাকে, ফলে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ে, যা হার্ট অ্যাটাকের প্রধান কারণ।
অক্সিজেনের অভাব: হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে হার্ট অ্যাটাক হয়।
২. গোসলের সময় ‘মারাত্মক’ যে ভুলটি করবেন না
শীতকালে বাথরুমে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা অহরহ ঘটে। এর প্রধান কারণ ভুল নিয়মে গোসল করা।
সতর্কতা: অনেকেই শীতে গোসলের শুরুতে মগে করে সরাসরি মাথায় ঠাণ্ডা পানি ঢালেন। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাথায় হঠাৎ ঠাণ্ডা পানি পড়লে শরীর ‘কোল্ড শক রেসপন্স’ (Cold Shock Response) করে। এতে মস্তিষ্কের রক্তনালী দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায় এবং তাৎক্ষণিক স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
সঠিক নিয়ম: গোসলের শুরুতে পায়ের পাতা ভেজান, এরপর শরীর এবং সবার শেষে মাথায় পানি দিন। সম্ভব হলে কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন।
৩. ঝুঁকিতে কারা আছেন?
সবারই সতর্ক থাকা উচিত, তবে নিচের ব্যক্তিদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি:
ঝুঁকিপূর্ণ গ্রুপ | কারণ |
|---|---|
উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রোগী | তাদের রক্তনালী আগে থেকেই দুর্বল থাকে। |
বয়স্ক ব্যক্তি (৫০+) | শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কম থাকে। |
ধূমপায়ী | শীতে ধূমপান রক্তনালীকে আরও বেশি সংকুচিত করে। |
ভোরের প্রাতঃভ্রমণকারী | কুয়াশা ও অতিরিক্ত ঠান্ডায় হার্টের ওপর চাপ পড়ে। |
৪. হার্ট অ্যাটাকের আগাম ৫টি লক্ষণ
শরীর খারাপ করার আগেই কিছু সংকেত দেয়। এগুলো অবহেলা করবেন না:
বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা অনুভব করা (মনে হবে পাথর বসিয়ে রাখা হয়েছে)।
বুকের ব্যথা বাম হাত, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া।
শীতের মধ্যেও হঠাৎ প্রচুর ঘাম হওয়া।
বিনা কারণে শ্বাসকষ্ট বা দম বন্ধ হয়ে আসা।
হঠাৎ মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
৫. বাঁচতে চাইলে যা করবেন (বিশেষজ্ঞ পরামর্শ)
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. শফিকুর রহমান (কাল্পনিক নাম/সাধারণ পরামর্শ) বলেন, জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন আনলেই এই ঝুঁকি ৯০% কমানো সম্ভব।
ভোরবেলা হাঁটাহাঁটি নয়: খুব ভোরে বা কুয়াশার মধ্যে না হেঁটে রোদ ওঠার পর হাঁটুন। অথবা বিকেলে হাঁটুন।
পোশাক নির্বাচন: একটি মোটা কাপড়ের বদলে একাধিক পাতলা সুতি বা উলের কাপড় পরুন (লেয়ারিং)। এটি শরীর বেশি গরম রাখে। কান ও মাথা ঢেকে রাখুন।
খাদ্যাভ্যাস: চর্বিযুক্ত মাংস (গরু/খাসি) এড়িয়ে চলুন। শীতের সবজি, বাদাম এবং ওমেগা-৩ যুক্ত মাছ বেশি খান। পানি পানে অনীহা দেখাবেন না, ডিহাইড্রেশন রক্ত ঘন করে দেয়।
বিছানা ছাড়ার নিয়ম: ঘুম ভাঙার সাথে সাথে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নামবেন না। শীতে মাসল স্টিফ থাকে। ঘুম ভাঙার পর ২-১ মিনিট বিছানায় বসে শরীর স্বাভাবিক হতে দিন, তারপর নামুন।
উপসংহার: শীত মানেই রোগবালাই নয়, যদি আপনি সচেতন থাকেন। আপনার পরিবারের বয়স্ক সদস্যটির প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখুন। বুকে ব্যথা অনুভব করলে গ্যাস বা গ্যাস্ট্রিক ভেবে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নিন।
প্রতিবেদক
লাইফস্টাইল ডেস্ক



